ঢাকা | শনিবার | ৯ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২২শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু হবে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল দেড় বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন শিল্পখাতের বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। ইতোমধ্যে তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং কোন কারখানাগুলো দ্রুত চালু করা যাবে, তার একটি তালিকা তৈরির নির্দেশ দেন। এই উদ্যোগ শুধুমাত্র কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদন বাড়ানোর জন্য নয়, এটি বিনিয়োগের পরিবেশও উন্নত করবে, যা সরকারের এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটাই এখন দেশের অর্থনীতিতে অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জানান গেছে, বিগত এক বছরে সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন প্রধান শিল্পাঞ্চলে তিন শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রধানত পোশাক শিল্প ও টেক্সটাইল খাতের কারখানাগুলোর বন্ধের কারণে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। মূলত আর্থিক সংকট, ঋণের উচ্চ সুদ, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং শ্রমিক অসন্তোষের কারণে এসব কারখানা বন্ধ হয়েছে।

সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, প্রথম ১৮ মাসে দেড় কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এই বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। শুধু তহবিলের সাহায্য নয়, কীভাবে দ্রুত শিল্পগুলোকে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা যায়, এর জন্য নীতিমালা ও নীতিগত সহায়তা অবলম্বন করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের বন্ধ থাকা কারখানা চালু ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তিনি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে কারখানা দ্রুত চালুর জন্য তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন।

এরই ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৪০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল পুনঃঅর্থায়ন (রিফাইন্যান্স) স্কিম চালুর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় বড় শিল্প খাতে ২০ হাজার কোটি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) জন্য ১০ হাজার কোটি এবং কৃষি খাতে ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হবে।

জানানো হয়েছে, এই তহবিলের গঠনের আগে ব্যাংকগুলো থেকে বন্ধ কারখানার তালিকা ও ঋণের হালনাগাদ তথ্য চাওয়া হয়েছে, বিশেষ করে ১০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে থাকা কারখানাগুলোর তালিকা। এর মধ্যে সম্পূর্ণ ও অর্ধেক বন্ধ কারখানাগুলোর আলাদা তালিকা চাওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আশরাফের নেতৃত্বে ১৯ সদস্যের একটি কমিটি এই বিষয়টির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে কাজ করছে। তারা ইতোমধ্যে ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করে মতামত নিয়েছেন।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকারের এই উদ্যোগ মানে বন্ধ কারখানা চালু করতে নীতিগত সুবিধা দেওয়া একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তবে বড় প্রশ্ন হলো, অর্থ কী থেকে আসবে। ব্যাংকগুলোতে তরলতার সংকট থাকায় এই প্রশ্ন বেশি জোরালো। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো যদি এই স্কিমের আওতায় অর্থায়ন করে, তাহলে বাজারে টাকার চাপ বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেতে পারে। তিনি সরকারকে দুইটি পরামর্শ দেন— এক, ব্যাংকের তরলতা সুবিধা সম্পন্ন ব্যাংক থেকে আংশিক অর্থ সংগ্রহ, এবং দুই, আসন্ন বাজেটের কিছু অংশ এই খাতে বরাদ্দ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, ব্যাংকগুলো থেকে তালিকা সংগ্রহের কাজ চলমান, এবং কিভাবে কারখানা চালু করা যাবে, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আলোচনা শেষ হলে তহবিল ও নীতিমালা জারি করা হবে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি বেড়ে থাকায়, এই তহবিল গঠন সরকারি অর্থ দিয়ে হওয়া সম্ভব।

প্রথমত, ব্যাংকগুলোকে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যাতে প্রস্তুত কাচামাল কেনাকাটার জন্য অর্থায়ন সহজ হয়। তবে কেউ দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকলে বা অনিয়ম করলে তাদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ থাকবে না। বাড়তি সতর্কতাও অবলম্বন করা হবে যাতে আর কোন অনিয়ম না ঘটে।

বেসরকারি শিল্প উদ্যোক্তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দিয়েছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য— ঋণ পুনঃতফসিলের সময় ডাউন পেমেন্টের শর্ত শিথিল, দ্রুত অর্থের নিশ্চয়তা, আমদানি-রফতানির সুবিধা বৃদ্ধি ও কম মার্জিনে এলসি খোলার সুযোগ।

বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, এই সিদ্ধান্ত অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। যদি এই উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়, তবে অর্থনীতির স্থবিরতা কাটিয়ে উঠবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং জিডিপি বৃদ্ধি পাবে। তিনি বলেন, এই কারখানাগুলো আগে থেকেই চালু থাকলে অর্থনীতিতে আরও গতি আসত ও কর্মসংস্থান আরও বৃদ্ধি পেত। পাশাপাশি, নতুন কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রেও অনেক সময় ও ব্যয়সম্মত প্রক্রিয়া সময় লাগে, যা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।

সর্বোপরি, যদি সরকার এই উদ্যোগের প্রতিপাদ্য গুরুত্ব বুঝে ফলপ্রসুভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও গতিশীলতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।