ঢাকা | বৃহস্পতিবার | ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে বেড়েছে কয়লার ব্যবহার

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ব জুড়ে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহে বড় বিঘ্ন ঘটেছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনেক দেশ এখন বিকল্প হিসেবে কয়লার দিকে ফিরে যাচ্ছে — বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোতে কয়লা ব্যবহার ও আমদানি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাজার বিশ্লেষক সংস্থা কেপলারের তথ্যে দেখা গেছে, চলতি মে মাসে বিশ্বব্যাপী কয়লা আমদানির পরিমাণ ৪ লাখ ৬৪ হাজার টন ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা বিশ্ব ইতিহাসে একটি তৃতীয় সর্বোচ্চ মাসিক রেকর্ড হবে। সাধারণত উত্তর গোলার্ধে শীতকাল শেষ হওয়ার পর এই সময়ে চাহিদা কমার কথা থাকলেও যুদ্ধের প্রভাব চিত্রটা পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।

কোয়ার চাহিদা বাড়ার ফলে আন্তর্জাতিক চালান ও পরিবহনের খরচও বেড়েছে। মার্কেট ডেটা প্রতিষ্ঠান আরগাস জানায়, ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় মে মাসে কয়লা পরিবহনের ভাড়া গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইন্দোনেশিয়া থেকে পণ্য পরিবহনের ভাড়া গত কয়েক মাসে ৬০–৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, আর অস্ট্রেলিয়া থেকে জাহাজ ভাড়া প্রায় ৪০–৫০ শতাংশ বাড়েছে। এ পর্যায়ের বাড়তি পরিবহন ব্যয় এবং জাহাজের ঘাটতি বিশ্বব্যাপী সরবরাহশৃঙ্খলে চাপ বাড়িয়েছে।

হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার প্রভাবেও তেল ও এলএনজি সরবরাহ অনিশ্চিত হওয়ায় এলএনজির ওপর নির্ভরশীল অনেক দেশ এখন কয়লা আমদানি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এশিয়ায় এই প্রবণতা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। থাইল্যান্ড বন্ধ করা কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় সচল করেছে, দক্ষিণ কোরিয়া পরিবেশগত বিধিনিষেধ শিথিল করে কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছে এবং যুদ্ধের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪ গিগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কয়লা থেকে উৎপাদন করেছে। জাপান ও ভিয়েতনামে ও এ ধরনের পুনরুদ্ধার ও চাহিদা বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।

আন্তর্জাতিক শিপিং অ্যাসোসিয়েশন বিমকোর তথ্যে এপ্রিল মাসে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে কয়লা সরবরাহ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে মাঝারি আকারের কয়লাবাহী পণ্যবাহী জাহাজগুলোর জরুরি চাহিদা তুঙ্গে পৌঁছেছে।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ কয়লা ব্যবহারকারী চীন তাদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বেশি পরিমাণ কয়লা সংগ্রহ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে পেট্রোকেমিক্যাল সরবরাহে ঘাটতি দেখা গেলে চীন কয়লা নির্ভর কেমিক্যাল উৎপাদন বাড়িয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি গ্রীষ্মে তীব্র তাপ বাড়লে এ অঞ্চলে কুলিং ডিমান্ড বেড়ে কয়লার চাহিদাও আরো বাড়বে।

সাধারণত জুলাই থেকে শীতের জন্য কয়লা মজুত করা শুরু করা হয়, কিন্তু বর্তমান অনিশ্চয়তার কারণে বহু দেশ আগেভাগে মজুত কার্যক্রম শুরু করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মধ্যেও বর্তমান জ্বালানি নিরাপত্তার বাস্তবতায় অনেক দেশই আপাতত দূষণকারী এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হচ্ছে। আগামী মাসগুলোতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার ও পরিবহন ব্যয়ে ওঠানামা এবং পরিবেশগত প্রভাবই প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।