ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিন্দানাও দ্বীপের উপকূলে সোমবার সকাল সাড়ে সাতটায় ৭.৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। সরকারি ও স্থানীয় সূত্রে বলা হচ্ছে, এই ভূমিকম্পে অন্তত ৩২ জন নিহত, ১৩৪ জন আহত এবং ৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র भू-তরঙ্গ জরীপকারী সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, ভূকম্পনের উৎপত্তিস্থল ছিল ভূ-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার গভীরে এবং এটি স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৭ মিনিটে অনুভূত হয়। ফিলিপাইনের সিসমোলজি সংস্থা ফিভলকস জানান, কম্পনটি ঘটেছে সারাঙ্গানি প্রদেশের জেনারেল সান্তোস সিটির উপকূলীয় এলাকায়, আলাবেল এলাকার কাছে।
সারাঙ্গানি প্রদেশের পুলিশ প্রধান বেনজি আনচেতা রয়টার্সকে বলেছেন, ‘‘এটি আমাদের অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।’’ ভূমিকম্পের সময় এক থানার পতাকা উত্তোলনের অনুষ্ঠানের সময় শক্তিশালী ঝাঁকুনি লাগে, যার ফলে থানার ভবনে ফাটল দেখা যায়। আতঙ্কে কয়েকজন অচেতন হয়ে পড়লেও হতাহতের খবর সেখানে ততক্ষণে পাওয়া যায়নি।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ভূমিকম্পে অন্তত ৩৭টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার অধিকাংশই বাণিজ্যিক স্থাপনা। জেনারেল সান্তোস সিটিতে সরকারি ভিডিও ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দৃশ্যে দেখা গেছে বড় বড় ভবন ও বিপণিবিতান ধসে পড়েছে; স্থানীয় একটি জনপ্রিয় ফাস্ট ফুড চেইনের অন্তত দুই শাখা সড়কের ওপর ভেঙে পড়েছে। ফিলিপাইনের রেড ক্রস দেশের সব কেন্দ্রে ‘সর্বোচ্চ সতর্কতা’ জারি করে জরুরি উদ্ধারকাজ শুরু করেছে।
প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ফার্ডিনান্ড মার্কোস জুনিয়র জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধারকাজ শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং আক্রান্তদের সতর্ক করে বলেছেন, ‘‘সুনামির সতর্কবার্তায় কান দিন। এখনই উঁচু স্থানে চলে যান — কোনো জিনিসের জন্য দেরি করবেন না, আপনার জীবন সবচেয়ে মূল্যবান।’’
ভূকম্পনের পর ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু অংশে সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়; পরে কয়েকটি অঞ্চলে সেটা প্রত্যাহার করা হয়েছে। মার্কিন সুনামি সতর্কীকরণ ব্যবস্থার তথ্য অনুযায়ী, ফিলিপাইনের কিছু উপকূলীয় এলাকায় জোয়ার স্তরের তুলনায় ১ থেকে ৩ মিটার উচ্চতার সুনামি ঢেউ আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফিভলকসও উপকূলীয়দের অবিলম্বে উঁচু ও নিরাপদ স্থানে সরতে নির্দেশ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে কোনো সুনামি হুমকি নেই বলে জানিয়েছে।
প্রসঙ্গত, ভূমিকম্পের পর এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬টি আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে; এগুলোর মাত্রা রিখটার স্কেলে ১.৩ থেকে সর্বোচ্চ ৬.৭ পর্যন্ত রিপোর্ট করা হয়েছে।
প্রতিবেশী ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ফিলিপাইনের এই ভূমিকম্পের প্রভাবে তাদের উত্তর-পূর্ব উপকূলে কয়েকটি স্থানে সুনামির ঢেউ শনাক্ত করা হয়েছে। দেশটির আবহাওয়া ও জলবায়ু সংস্থা বিএমকিজি জানিয়েছে, উত্তর মালুকু প্রদেশের কেডি, উলু সিয়াউ ও মেলোঙ্গুয়ানে স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ২০ মিনিটের দিকে ছোট মাঝারি আকৃতির ঢেউ দেখা গেছে; তবে ঢেউগুলো জোয়ার স্তরের ওপর মাত্র ০.০৯ থেকে ০.১৯ মিটার পর্যন্ত উচ্চতায় ছিল। জাপান সরকারও দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও ওকিনাওয়া এলাকায় সম্ভাব্য এক মিটার উচ্চতার সুনামি নিয়ে সতর্কবার্তা জারি করে উপকূলীয়দের নিরাপদ স্থানান্তর করার আহ্বান করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও জাপান—all তিন দেশই প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এ অবস্থিত, যেখানে টেকটোনিক প্লেটের ক্রমাগত নড়াচড়ার কারণে শক্তিশালী ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরি সম্পর্কিত ঘটনা ঘন ঘন ঘটে। সরকারী ও উদ্ধারকারী দলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি সহায়তা ও করণীয় চিহ্নিত করতে কাজ করে যাচ্ছে।








