ঢাকা | শুক্রবার | ১২ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৬শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

টিআইবির উদ্বেগ প্রকাশ করে খসড়া মানবাধিকার কমিশন আইনের পরিবর্তনসমূহ

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সম্প্রতি খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬ সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি মনে করে, এই খসড়ার ভিত্তিতে যদি নতুন মানবাধিকার কমিশন গঠন করা হয়, তবে এটি একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি সংস্থা হিসেবে রূপান্তরিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবেনা। এই উদ্বেগের কথা বুধবার (১০ জুন) এক বিবৃতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।

টিআইবির বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের সঙ্গে তুলনায় খসড়া আইনে কিছু পরিবর্তন এসেছে যা একটি স্বতন্ত্র ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত ‘প্যারিস নীতিমালা’র মানদণ্ডের সঙ্গে এই খসড়া সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ‘২০২৫ সালের অধ্যাদেশে বলা হয়েছিল যে, কমিশন একটি স্বাধীন সংস্থা হবে এবং এর অধীন ndryাসনের কোনও মন্ত্রণালয় বা বিভাগের নেতৃত্বে থাকবে না। কিন্তু নতুন খসড়া আইন সেই গুরুত্বপূর্ণ দফাটিই বাদ দিয়েছে। ফলে সংস্থাটির ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বৃদ্ধি পাবে এবং এটি স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা হারাবে।’

এছাড়াও, নিয়োগপ্রক্রিয়ার জন্য প্রস্তাবিত বাছাই কমিটি গঠনেও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি। এই কমিটিতে সংসদের স্পিকার, দুজন মন্ত্রী, একজন সরকারি দলীয় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের উপস্থিতি রাখা হয়েছে, যা সম্পূর্ণভাবে সরকারি দলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা তৈরি করে। সংস্থাটির মতে, এই কাঠামো নিয়োগের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ণ করবে এবং স্বার্থের দ্বন্দ্বের সৃষ্টিও সম্ভব। এর পরিবর্তে, সংস্থাটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরপেক্ষ নিয়োগপ্রক্রিয়া দাবি করছে।

অন্যদিকে, কমিশনের কার্যপরিধি এবং ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য টিআইবি প্রস্তাব করছে, যেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও অবস্থিত আটক কেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত অনুসন্ধান ও পরিদর্শন করার ক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানে নিশ্চিত হয়। গুম, নির্যাতন ও বেআইনি আটক সন্দেহের ক্ষেত্রেও স্বাধীন ও কার্যকর তদন্তের বিকল্প নেই বলে মনে করে সংস্থাটি।

এছাড়াও, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বর্তমানের মতো সরকারের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা বাতিল করে, আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা নির্বাচিত কমিশনের অনুমতিই যথেষ্ট হবে বলে দাবি জানানো হয়।

প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, কমিটির মধ্যে অন্তত একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং কমপক্ষে দুজন নারী কমিশনার থাকতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা ভিত্তিতে নিয়োগের জন্য নির্ধারিত ছুটি বয়ে আসা কমিশনার পদে নিয়োগের প্রতি ক্ষতিকর ক্ষতিসাধন বন্ধ করে, সততা, যোগ্যতা ও মানবাধিকার বিষয়ে স্পষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণের দাবি করেছে টিআইবি। সরকারি কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগের শতাংশ এর আগে ৩০% থেকে কমিয়ে ১০% এ নামিয়ে আনতেও সুচিন্তিত প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এছাড়া, কমিশনের বাজেটের স্বাধীকার নিশ্চিত করতে অনির্ভরশীল অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করে সংস্থাটি।

টিআইবি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, একটি প্রকৃত ও স্বতন্ত্র মানবাধিকার কমিশন থাকলে তার স্বাধীনতা হারালে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এটি কেবল মানবাধিকার নিয়ে নয়, পুরো রাষ্ট্র পরিচালনার সুনির্দিষ্ট চিত্রকেও সংকটে ফেলতে পারে। এর ফলে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল এবং সাধারণ নাগরিক—সবারই ক্ষতি হবে।

অতিরিক্তভাবে, ভুক্তভোগীরা যাতে অধিকারের সুরক্ষা পান, সে জন্য সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ও গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সকলের মতামত ও পরামর্শকে মূল্য দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটি অধিকতর সংশোধন ও পরিবর্তনের মাধ্যমে এই খসড়া আইনকে আধুনিক, কার্যকর ও স্বাধীন মানবাধিকার ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে অনুরোধ করেছে।