ঢাকা | শুক্রবার | ১৭ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৩রা সফর, ১৪৪৮ হিজরি

রিজার্ভ চুরির মহাকেলেঙ্কারির তদন্তে ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মহা কেলেঙ্কারির তদন্ত দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে চললেও এতদিন কেবল ধোঁয়াশা ও তদন্তের পেছনো অবস্থায় ছিল। অবশেষে, সিআইডি দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ধাপ গ্রহণ করে ১০ হাজার পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র প্রস্তুত করেছে। এতে দেশি-বিদেশি মোট ৬৪ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যার মধ্যে রয়েছে খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও শীর্ষ কর্মকর্তারা, তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই অভিযোগপত্র কেবল আইনি প্রক্রিয়া নয়, এটি দেশের সার্বভৌম অর্থনীতির জন্য মুখোশ উন্মোচনের এক গুরুত্বপূর্ণ দস্তাবেজ।

বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সিআইডির মুখপাত্র জসীমউদ্দিন খান গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের ব্যাংকের এই মামলার খসড়া অভিযোগপত্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত পর্যায়ে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আল মামুন বলেন, সব স্বচ্ছন্দে শেষ হয়েছে এবং খুব দ্রুত আদালতে চার্জশিট দাখিলের জন্য প্রস্তুতি চলছে। এই খসড়া অভিযোগপত্রটি আইন পর্যালোচনার জন্য অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রাচীন তদন্ত ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ডিজিটাল ফরেনসিক, মার্কিন এফবিআই’র রিপোর্ট, এমএলএআর ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ, বিদেশি আর্থিক তথ্য এবং সাক্ষীদের জবানবন্দির ভিত্তিতে এটি তৈরি হয়েছে।

অভিযোগপত্রে উল্লেখিত ব্যক্তিদের মধ্যে সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, ব্যাংকের সাবেক সদস্য ও কর্মকর্তারা রয়েছেন। পাশাপাশি, ফিলিপিন্সের বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ, প্রতিষ্ঠান ও দেশের আর্থিক সংস্থাগুলোর নামও এই মামলার অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছে। তারা সবাই এই আন্তর্জাতিক চুরি-বৈধজালিয়াতির সাথে যুক্ত। এছাড়াও, অভিযুক্তের মধ্যে আছেন ভারতের নাগরিক ও নাগরিকসংস্থা, উত্তর কোরিয়ার বিশেষ হ্যাকার দল, চীনের নাগরিকরা এবং জাপানের একাধিক ব্যক্তির নাম।

আন্তর্জাতিক এই চুরি-জালিয়াতির জন্য দায়ী মূলত অসাধু ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান, ভুয়া এনজিও আর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হ্যাকার গ্রুপ। এই ব্যাপক লক্ষ লক্ষ ডলার কারচুপির ঘটনা যেন ছিল এক ধূর্ত পরিকল্পনা, যেখানে কেবল কম্পিউটার চৌকসতার পরিচয় দিয়ে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘সুইফট’ সিস্টেমের নিরাপত্তা ভেঙে, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের মারফত বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে কোটি কোটি ডলার চুরি করা হয়। এই ঘটনায় প্রথমে মনে করা হয়েছিল, বাইরের দিকের হ্যাকারদের কসরত। কিন্তু পরে জানা যায়, ভেতরকার দুষ্ট চক্রের যোগসাজশ ছিল এই সংঘটিত ঘটনায়।

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে, বিভিন্ন ভুয়া ব্যাংকিং বার্তা পাঠিয়ে, ভয়ঙ্কর এই চুরি সংঘটিত হয়। মূলত, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রায় ৮১০ কোটি টাকারও বেশি অর্থের অপচেষ্টা চালানো হয়। এই অর্থের মধ্যে একাংশে জালিয়াতি করে ‘সুইফট’ পদ্ধতির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে থাকা অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়। উল্লেখ্য, ‘ভুল বানান’ বা ‘ভুল তথ্য’ দিয়ে চালানো এই জালিয়াতির শেষ ঘটনার মধ্যে, ফিলিপাইনের একটি ব্যাংক ও শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন ব্যাংক থেকে এই অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা চালানো হয়।

প্রসঙ্গত, এসব জালিয়াতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু দেশের নাগরিক ও প্রতিষ্ঠান শামিল রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ইতিহাস-অর্থনৈতিক ট্র্যাজিক ঘটনায় যারা সম্পৃক্ত, তাদের বিরুদ্ধে এখনও মানবিক ও আইনি ব্যবস্থা চলমান। এই ঘটনার তদন্ত ও বিচারের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর এখন তড়িৎ ও ন্যায়সঙ্গত বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে।

অপরাধের এই মহা কেলেঙ্কারির মূল রহস্য ছিল একদল অপরাধীর পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক হ্যাকার গ্রুপের সহযোগিতা। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক ‘সুইফট’ এর নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক ভেঙে চলে ব্যাপক অপচেষ্টা। একদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়ার্কের ফেডের মাধ্যমে কোটি কোটি ডলার চুরি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক জালিয়াতি, বিদেশি হ্যাকার, অর্থপাচার ও জুয়ার অপারেশন—all মিলিয়ে এই ঘটনাকে ধরা হয় বিশ্বব্যাপী এক ঝকঝকে অটুট স্মৃতি হিসেবে।

পরবর্তীতে, এই ভয়ংকর তথ্য ফাঁস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ও শীর্ষ কর্মকর্তা তাঁদের পদ থেকে প্রস্থান করেন। সিআইডির মাধ্যমে তদন্তের প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পর, এখন এই বৃহৎ মামলার বিচার একটি নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে, এই তদন্তের ফলে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হবে বলে প্রত্যাশা।