ঢাকা | শুক্রবার | ২৬শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১১ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান চুক্তি: নেতানিয়াহু রাজনৈতিক সংকটে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থানকে ব্যপকভাবে প্রভাবিত করেছে — আর তার সবচেয়ে তীব্র প্রভাব পড়েছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর উপর। বহু বছর ধরে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে নিজের প্রভাবশালী অবস্থান প্রতিষ্ঠা করা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কাহিনী এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই একটি নির্দিষ্ট কূটনৈতিক দর্শনের ওপর তার রাজনৈতিক পরিচয় দাঁড় করিয়েছিলেন: আমেরিকার নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক ধরে রেখে ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষায় ওয়াশিংটনকে পরিচালিত করার ক্ষমতার দাবি। এমনকি কূটনীতিবিদরা রসিকভাবে তাকে ‘আমেরিকান হুইস্পারার’ও বলতেন — এমন এক নেতা যে একটি ফোন কলেই মার্কিন কৌশল বদলে দিতে পারে।

তবে গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরানবিরোধী ক্ষণস্থায়ী অবস্থান ও তার অবসানে ট্রাম্প প্রশাসনের তেহরানের সঙ্গে নতুন চুক্তি এই কাহিনীকে উল্টে দিয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এখন আর নয়, বরং ওয়াশিংটনই নির্ধারণ করছে নীতির ধারা এবং নেতানিয়াহুকে সেই শর্তগুলো মেনে নিতে হচ্ছে। সূত্রগুলোর উদ্ধৃতিতে, ট্রাম্প এমন মনোভাব পোষণ করছেন যে ইসরায়েলের আপত্তিগুলো কেবল সামান্য প্রতিবন্ধকতা মাত্র — এবং প্রয়োজনে নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনের নির্দেশ মেনে চলবেন।

সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ও কূটনীতিবিদরা অভিন্নভাবে বলছেন, নেতানিয়াহুর সামনে একদিকে রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের তৎপরতার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শেষ করার তীব্র চাহিদা, অন্যদিকে রয়েছে তার নিজ দেশের কঠোরপন্থী ভোটব্যাংক যারা লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিরোধী। এই দুই চাহিদার মধ্যে বাঁধা পড়ে তিনি এখন রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা।

ডেনিস রসের মত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লেবানন থেকে সেনা সরালে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষোভ জেগে উঠবে; আর যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করেন, তাহলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়বে। এমন অবস্থায় নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্তগ্রহণ কঠিন হয়ে উঠেছে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার একাকীত্ব বাড়তে পারে — বিশেষ করে আগামী শরৎকালীন নির্বাচনের আগে।

নেতানিয়াহুর সাবেক উপদেষ্টা আবিভ বুশিনস্কি এই চুক্তিকে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের জন্য ‘‘চূড়ান্ত ঘা’’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষায়, শুধু ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা প্রয়াসেই ব্যর্থ হননি, বরং জুটি হিসেবে দেখা হয়েছিল এমন ঘনিষ্ঠ মিত্রকেও তিনি হারিয়ে ফেলেছেন, ফলত আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতা বাড়ছে।

নেতানিয়াহুর অফিস এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য দেয়নি। তবে সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অংশীদারিত্বের মতো — একাধিক বিষয়ে মিল থাকলেও কিছু বিষয়ে অমিল থাকা স্বাভাবিক। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চালানো প্রচারণা তার দেশের কৃতিত্বগুলোকে খাটো করছে।

হোয়াইট হাউস ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি এখনও ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি দৃঢ় ও অটুট। এক সূত্র জানিয়েছে, লেবাননের হিজবুল্লাহর হুমকি পুরোপুরি কেন্দ্রীভূত না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের জন্য সুবিবেচিত প্রত্যাহারের বাধ্যবাধকতা নেই এবং ইসরায়েলের স্ব-রক্ষার পূর্ণ অধিকার বজায় থাকবে। তবু ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি যুদ্ধের ঝুঁকি থেকে নিজেকে বিরত রাখতে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে আরব বিশ্বের কূটনৈতিক পুনর্মিলনকে এগিয়ে নিতে চাইছে।

পরবর্তী কিছু মাসে নেতানিয়াহুর সামনে রাজনৈতিকভাবে তীব্র চাপ ও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে — অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পরিস্থিতি কীভাবে গড়ায় এবং কবে পর্যন্ত তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেকে পুনরায় স্থাপন করতে পারবেন, তা আগামী নির্বাচনী মুহূর্তগুলোতেই স্পষ্ট হবে।