বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট আগে এক মহাকাব্যিক পর্যায় পার করেছে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের শেষদিকে, দেশের রিজার্ভ ছিল মাত্র ৩৬.৯৮ বিলিয়ন ডলার, তখন দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তবে এর পরে সরকার এবং বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে শুরু করে। বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারো ৩৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য এক বড় ইতিবাচক পরিবর্তনের সংকেত। এই রেজাল্ট দেশের অর্থনীতির জন্য আশার আলো তৈরি করছে, যেখানে টেকসই উন্নয়ন ও বিনিয়োগের পরিবেশ পুনরুদ্ধার হচ্ছে।
গত ১২ মাসে প্রবাসী বাংলাদেশীরা শতভাগ নিয়ম মেনে দেশের জন্য বিপুল পরিমাণ প্রবাসী আয়ের রেকর্ড করেছেন। মাত্র এক বছরেই প্রবাসীরা প্রায় ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাঠিয়েছেন, যা রিজার্ভের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির ফলে এখন দেশের রিজার্ভ ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় রয়েছে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার। প্রবাসী আয়ের এই উন্নতিতে উৎসাহিত করতে সরকার ২.৫ শতাংশ প্রণোদনা প্রদান করেছে, যা বৈধ উপায়ে রেমিট্যান্স পাঠানোকে আরও সহজ ও নিরাপদ করে তুলছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এই রেমিট্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেশের জীবনমান উন্নয়ন, বৈদেশিক মুদ্রার সংরক্ষণ, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ, কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহায়ক।
সাম্প্রতিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, চলতি মাসের শুরুতে (১ জুন) দেশের মোট রিজার্ভ ছিল ৩৪.৭৬ বিলিয়ন ডলার, এবং বিপিএম-৬ অনুযায়ী ছিল ৩০.১ বিলিয়ন ডলার। এক মাসের ব্যবধানে এই রিজার্ভ প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরেও রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৩৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। তবে তা পরবর্তী সময়ে নানা কারণে ক্ষতি হতে থাকে। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় রিজার্ভ এসে পৌঁছায় ২৫.৯২ বিলিয়ন ডলারে। তবে নতুন সরকারের কার্যক্রমের মাধ্যমে ধীরে ধীরে রিজার্ভ পুনরুদ্ধার হওয়ায় পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে।
বিশেষ করে, হুন্ডি বন্ধের কার্যক্রম, বৈধ ও বৈধ পথে প্রবাসী আয় পাঠানো বাড়ানো, আমদানির ওপর বিধিনিষেধ শিথিলের ফলে বৈদেশिक মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই সামগ্রিক ব্যবস্থায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে এবং রিজার্ভ আবারো উচ্চ অঙ্কে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হুন্ডি ও অর্থ পাচার রোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়বে, এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার আরও স্থিতিশীল হবে। সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, “প্রবাসী আয় বাড়ার অন্যতম কারণ হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ কমে যাওয়া। এর ফলে বৈধ পথে ডলার পাঠানো ও গ্রহণের সহজতর প্রক্রিয়া তৈরি হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “এত সব উদ্যোগের ফলে দেশের রিজার্ভ বাড়ছে এবং টেকসই অর্থনৈতিক পরিবেশ ফিরতে শুরু করেছে।”
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনও মত প্রকাশ করে বলেন, “রেমিট্যান্সের বৃদ্ধি রিজার্ভ পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ব্যাংকগুলোর এলসি খোলার সমস্যা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে এবং অর্থনীতি সচল হচ্ছে।” এই সকল উন্নতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি যেন আরও দৃঢ় হচ্ছে, এই প্রত্যাশা সর্বজনীন।








