বঙ্গোপসাগরের গভীরে টুনা ও উচ্চমূল্যের অন্যান্য পেলাজিক মাছের সম্ভাবনা বিরাট। তবে আধুনিক লংলাইনার জাহাজ, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও বেসরকারি বিনিয়োগ না থাকায় বাংলাদেশ এখনও সেই সম্পদকে কাজে লাগাতে পারেনি। ফলে প্রতি বছর লক্ষণীয় পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ মিস হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি থাকলে টুনা রপ্তানি থেকে বছরে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মতো আয় সম্ভব — যা প্রায় তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর জন্য দরকার হবে গভীর সমুদ্রে চলে যেতে সক্ষম লংলাইনার জাহাজ, আন্তর্জাতিক মানের কোল্ড চেইন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা, এবং দক্ষ জনবল।
এখন দেশের ক্যানজাত টুনার চাহিদার বেশিরভাগই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। দেশে উৎপাদন শুরু হলে আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং স্থানীয় শিল্পসামগ্রিকভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই কারণেই সরকার গভীর সমুদ্রে টুনা ও সমজাতীয় মাছ আহরণে একটি বিশেষ প্রকল্প শুরু করেছে। প্রকল্পে তিনটি বিশেষায়িত লংলাইনার জাহাজ সংগ্রহ, সম্ভাব্য মৎস্যক্ষেত্র চিহ্নিতকরণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির কাজ চলছে।
২০১২ সালে মিয়ানমার ও ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ প্রায় ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক এলাকা পেয়েছে; এর বড় অংশ এখনও অনাবিষ্কৃত। স্যাটেলাইটভিত্তিক সমুদ্র পর্যবেক্ষণ, এসএসটি (সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা), ক্লোরোফিল ঘনত্ব ও আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণে সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড, বাংলাদেশের ইইজেড এবং আন্দামান সাগরসংলগ্ন গভীর সমুদ্রকে টুনা আহরণের সম্ভাবনাময় স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই এলাকায় ইয়েলোফিন, স্কিপজ্যাক, বিগ আই ও লংটেইলসহ টুনা ও টুনাসদৃশ একাধিক প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়।
তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালে শ্রীলঙ্কা বছরে ১,১২,৪৯৪ মেট্রিক টন এবং ভারত ৫২,০২২ মেট্রিক টন টুনা ও বিলফিশ আহরণ করলেও বাংলাদেশের আহরণ মাত্র ১৪,৫০০ মেট্রিক টন, যার অধিকাংশই ট্রলারের পার্শ্ব-আহরণ। অর্থাৎ আমাদের সম্পদ এখনও পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহৃত হচ্ছে না।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) মনে করা, দেশের নীল অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অপ্রয়োগিত ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো গভীর সমুদ্রে টুনা আহরণ। বিডা আনুমানিক বলছে, যদি ২০৩৫ সালের মধ্যে ২৫–৫০টি আধুনিক লংলাইনার জাহাজের বহর গড়ে তোলা যায়, তবে বছরে ৩০–৫০ হাজার মেট্রিক টন টুনা আহরণ সম্ভব হবে এবং তা থেকে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় আসতে পারে। প্রায় ১৫০ কোটি টাকার বিনিয়োগে ১০টি জাহাজের একটি বাণিজ্যিক বহর গড়ে তোলার কথা বলা হচ্ছে এবং অনুমান করা হচ্ছে পাঁচ বছরের মধ্যে সেই বিনিয়োগ পূরণ হতে পারে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুণ জানিয়েছেন, গভীর সমুদ্রের মৎস্য আহরণকে একটি নতুন শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে প্রযুক্তি, বিশেষায়িত জাহাজ ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা আনতে হবে। এজন্য জাপানসহ কয়েকটি দেশের বিনিয়োগকারীর সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং ইতোমধ্যে দুইটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার উপযোগী জাহাজ নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, শুধু জাহাজ মালিকানা যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক মানের কোল্ড চেইন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট, ক্যানিং কারখানা, মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাব এবং রপ্তানি অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। এসব সাপোর্ট সিস্টেম ছাড়া স্বল্পমূল্যে উচ্চমানের মাছ সরবরাহ করা যাবে না।
এছাড়া উপকূলীয় কিছু এলাকাকে সামুদ্রিক চাষ ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলারও বড় সুযোগ আছে — কক্সবাজার-টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন, মহেশখালী-সোনাদিয়া, কুতুবদিয়া, সন্দ্বীপ ও খুলনা-সাতক্ষীরা এসব কেন্দ্র হতে পারে। এসব অঞ্চলে সামুদ্রিক মাছ, শৈবাল, ঝিনুক ও কাঁকড়া চাষ উন্নয়ন করলে স্থানীয় পরিবেশ অনুবর্তী রেখে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল ও বেসরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করলে গভীর সমুদ্রের এই ‘রূপালি সোনা’ বাংলাদেশের নীল অর্থনীতির এক শক্তিশালী চালিকা শক্তি হয়ে উঠতে পারে। রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নে এটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে—তবে তা বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো বিনিয়োগ জরুরি।








