ঢাকা | বুধবার | ১৫ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩১শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১লা সফর, ১৪৪৮ হিজরি

বন্যা ও পাহাড়ধসের নিসর্গ সংকট: ৫৪ জনের মৃত্যু, একলাখের বেশি পরিবার পানিবন্দি

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক বন্যা ও পাহাড়ধসের কারণে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৫৪ এ পৌঁছেছে। এ ঘটনায় অন্তত ৩৯ জন আহত হয়েছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সোমবার (১৩ জুলাই) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১টি পরিবারের বাস বন্যার পানিতে ডুবি অবস্থায় রয়েছে, যা মোট ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ জনে দাঁড়িয়েছে।

সরকারি প্রতিবেদনে জানানো হয়, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলাসহ ৫৯টি উপজেলা এখন পানিবন্দি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সব মিলিয়ে ৩৩৪টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা। জেলা ভিত্তিক মৃত্যুর পরিসংখ্যান বলছে, কক্সবাজারে সর্বোচ্চ ৩১ জনের মৃত্যু ঘটেছে। এর পরে চট্টগ্রামে ১৩, বান্দরবানে ছয়, রাঙ্গামাটিতে তিন ও মৌলভীবাজারে একজনের প্রাণহানি হয়েছে। আহতের মধ্যে কক্সবাজারে ২৪ এবং চট্টগ্রামে ১২ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

প্রশাসন দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিপন্ন মানুষদের জন্য ১ হাজার ৪২টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে ইতিমধ্যে ৩৮ হাজার ৪২২ জন আশ্রয় নিয়েছেন। পাশাপাশি সব ক্ষতিগ্রস্ত জেলায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। প্রত্যেক উপজেলা থেকে মেডিকেল টিম কাজ করছে এবং পরিস্থিতি মনিটরিংয়ের জন্য জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, “বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার। প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইন ও অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রী দ্রুত পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।” তিনি আরও জানান, বর্তমানে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দারবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু রয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি নজরদারিতে একজন করে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক নিয়োজিত থাকছেন।

আঞ্চলিক পরিস্থিতির বিষয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া এলাকায় বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। তবে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন অনেক পরিবার, কিন্তু কিছুক্ষেত্রে বাসাবাড়ি কাদা ও আসবাবপত্রের ক্ষতিসহ নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে বাঁশখালীতে পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক, যেখানে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি এবং নতুন ভারী বর্ষণে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। কক্সবাজারে সামান্য উন্নতি হলেও ৬৬টি ইউনিয়ন ও আড়াই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন।

সিলেট ও সুনামগঞ্জে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে, ফলে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র। প্রাণিসম্পদ ক্ষতিও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় ১ লাখ ১২ হাজারের বেশি গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি মারা যাওয়ায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে জানা যায়, ১৫ জুলাই পর্যন্ত বৃষ্টির তীব্রতা কম থাকতে পারে, তবে মৌসুমি বাতাস সক্রিয় থাকায় আবারও ভারী বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে। জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানিয়েছেন, নিম্নচাপের প্রভাব কমলেও বঙ্গোপসাগরে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকছে, ফলে পুরো মাস জুড়েই বৃষ্টিপাতের ধারাকে অব্যাহত রাখা शक্য।

অবশ্যই দেশের বড় অংশের বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেও কিছু শিক্ষা তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে চলমান এসএসসি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। অনেক পরীক্ষার্থী কোমরসমান পানি পার করে বা নৌকায় করে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে বাধ্য হয়েছে, যা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা। শুধু চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত থাকলেও অন্যান্য বোর্ডের পরীক্ষা যথারীতি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ঝুঁকিপূর্ণ প্রস্তুত জেলাগুলোর জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসাসামগ্রী মজুত রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়ে বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ ১১ জেলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করে সব ধরনের চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইন, অ্যান্টিভেনম ও অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রী প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় থেকে অতিরিক্ত মেডিকেল টিমও পাঠানো হবে।”