১৭ জুলাই শুক্রবার ভারতীয় রেলের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের প্রথম হাইড্রোজেন চালিত ট্রেন উদ্বোধন করেন, যা পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে ভারতের অগ্রযাত্রাকে এক ধাক্কা দিয়েছে।
গত ২২ মে ইন্ডিয়ান রেল বোর্ড (আইআরবি) এই বিশেষ ট্রেনকে যাত্রী পরিবহনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। বোর্ড জানিয়েছিল এটি বিশ্বের দীর্ঘতম ও সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোজেন-চালিত ব্রডগেজ ট্রেনগুলোর মধ্যে একটি। সফল ট্রায়াল রান সম্পন্ন হওয়ার পর এখন থেকে এই ট্রেনটি নিয়মিত যাত্রী নিয়ে নির্দিষ্ট রুটে চলবে।
হাইড্রোজেনকে ‘পরিচ্ছন্ন জ্বালানি’ বলা হয় কারণ হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলে ভেতরে জ্বালানির রসায়ন থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় এবং এর ফলে মূলত কেবল জলীয় বাষ্প ছাড়াই চলাচল সম্ভব। ফলে বাষ্প-প্রধান নির্গমন কার্বন নিঃসরণকে প্রাণহীন স্তরে নামিয়ে আনতে সহায়তা করবে। জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান ও চীনসহ বেশ কিছু উন্নত দেশ ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে—এবার সেই তালিকায় ভারতের নামও যোগ হলো।
‘Hydrogen for Heritage’ নামের প্রকল্পের আওতায় পুরোপুরি দেশীয় প্রযুক্তিতে এই ট্রেন তৈরি করা হয়েছে। হরিয়ানার জিন্দ থেকে সোনিপত পর্যন্ত ৮৯ কিলোমিটার রুটেই প্রথম পর্যায়ে এটি চালানো হবে। যাত্রাপথে ট্রেনটি পান্ডু পিন্দারা জংশন, ললিতখেরা হল্ট, ভামভেওয়া, ইসাপুর খেরি হল্ট, বুটানা হল্ট, খান্দরাই হল্ট, রাবরাহ হল্ট, লাথ হল্ট, মোহানা এবং বারওয়াসনি হল্টসহ একাধিক স্টেশনে থামবে। প্রথম রুটটি সফল হলে ভবিষ্যতে কালকা থেকে শিমলা পর্যন্ত জনপ্রিয় পাহাড়ি পথে এই প্রযুক্তি চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
কারিগরি দিক থেকে ট্রেনটির সর্বোচ্চ ডিজাইনগত গতি ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার হলেও অপারেশনালভাবে এটি সাধারণত ঘণ্টায় ৭৫ কিলোমিটার বেগে চলবে। ট্রেনটিতে মোট ২,৬০০ জন যাত্রী বহন করার ক্ষমতা রয়েছে। সেটআপে দুটি হাইড্রোজেন ড্রাইভিং পাওয়ার কার এবং আটটি যাত্রিবাহী কোচ রয়েছে। প্রতিটি পাওয়ার কারে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল, লিথিয়াম আয়রন ফসফেট (LiFePO4) ব্যাটারি এবং হাইড্রোজেন সংরক্ষণের জন্য বিশেষ সিলিন্ডার সংযুক্ত করা আছে। প্রতিটি পাওয়ার কার প্রায় ১,২০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত শক্তি উৎপাদন করার সক্ষমতা রাখে।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্রেনে হাইড্রোজেন লিক ডিটেক্টর, ফ্লেম ডিটেক্টর ও ধোঁয়া ও তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণের জন্য ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। রিসার্চ ডিজাইন অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অর্গানাইজেশন (আরডিএসও)-এর তত্ত্বাবধানে নকশা ও উৎপাদন সম্পন্ন হওয়ায় রেল অপারেশনে এটির স্থায়ীত্ব ও নিরাপত্তা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই ট্রেনের যাত্রা ভারতের রেল ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। হাইড্রোজেন প্রযুক্তি বিস্তৃত হলে ভবিষ্যতে দূষণ হ্রাস, জ্বালানি বৈচিত্র্য ও পরিবহন খরচের দিক থেকেও তা বড় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।







