গত বছর হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে বাংলাদেশের কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা উৎখাতের জন্য আন্দোলন করেছিল। সেই আন্দোলনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, যা এক বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে। কিন্তু মানবাধিকার রক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
এই সংস্থা নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে যে ভীতি, দমন-পীড়ন এবং গুমের ঘটনা ঘটত, সেগুলোর কিছুটা অবসান ঘটলেও এখন অন্তর্বর্তী সরকার কথিত রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে নির্বিচার আটক ও দমন-পীড়ন চালাচ্ছে। মানবাধিকার সুরক্ষায় তাদের কাঠামোগত সংস্কারের অভাব চোখে পড়ে।
এইচআরডব্লিউয়ের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘‘এক বছর আগে যারা শেখ হাসিনার নিপীড়নমূলক শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন তাদের মানবাধিকারভিত্তিক গণতন্ত্রের আশা এখনো পূরণ হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার অনেক ক্ষেত্রে স্থবিরত্বের শিকার, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর সংস্কার ব্যাহত ও সহিংস ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।’’
২০২৪ সালে গঠিত ১১টি সংস্কার কমিশন এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা ও দেশি-বিদেশি কর্মীদের সুপারিশ এখনও অমীমাংসিত, যা অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে একটি বড় বাধা।
দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, ধর্মীয় কট্টরপন্থিদের হাত থেকে সংখ্যালঘু ও সাংবাদিকদের নির্যাতন উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রংপুর ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে।
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশের বাইরে চলে যাওয়ার পর নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে পাঁচ সপ্তাহে ১,৪০০ জনের মৃত্যু হয় বলে জাতিসংঘের তথ্য প্রকাশিত হয়। এরপর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হলেও হেফাজতে নির্যাতন এবং মৃত্যুর ঘটনা থামানো যায়নি, যা নিরাপত্তা খাত改革ের জরুরি প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
জনগণের বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ সত্ত্বেও নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক হাজার হাজার নির্বিচার গ্রেপ্তার এবং হত্যাকাণ্ডের মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশ মামলার আসামিরা অজ্ঞাত পরিচয়। অনেক রাজনীতিক, সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতাও এ মামলার অন্তর্ভুক্ত হলেও তারা অনেকেই প্রতিরক্ষা পাচ্ছেন না।
এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, যে আইন ও বিশেষ ক্ষমতার মাধ্যমে অভিযোগ ছাড়াই অধিকারহীন আটক পরেছে, তা বন্ধ করার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর যেসব সদস্য মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত তাদের বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
২০২৪ সালের আগস্টে গঠিত গুম তদন্ত কমিশন ১,৮০০-এর বেশি অভিযোগ পেয়েছে; তবে নিরাপত্তা বাহিনী প্রমাণ নষ্ট ও সহযোগিতায় বাধা দিচ্ছে। অনেক অভিযুক্ত সদস্য এখনো নিরাপত্তা সংস্থায় কর্মরত এবং শীর্ষ কর্মকর্তা দেশে না থেকে পালিয়ে গেছেন।
অনেক গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকার তা বাস্তবায়নে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। নারীদের পূর্ণ অংশগ্রহণ এবং অধিকার সুরক্ষা এখনো ব্যাহত আছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ রাষ্ট্র ও জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তর্বর্তী সরকারকে সহায়তা করার আহবান জানিয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং বিচার নিশ্চিত না করলে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি টেকসইভাবে উন্নতি করতে পারবে না।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলি আরও বলেন, ‘‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, কিন্তু সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে এখনই কার্যকর ও সংকল্পবদ্ধ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোকে অতীত অনাচার পুনরাবৃত্তি রোধে দৃষ্টান্ত স্থাপন এবং মানবাধিকার রক্ষায় একযোগে কাজ করতে হবে।’’








