ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার অনুযায়ী দেড় বছরের মধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বন্ধ থাকা শিল্পকারখানা পুনরায় চলমান করার উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে দ্রুত চালু করা যায় এমন কারখানার তালিকা প্রস্তুত করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
কারখানা চালু করা শুধুমাত্র কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা উৎপাদন বাড়ানোর বিষয় নয় — এটি বিনিয়োগ পরিবেশ পুনরুদ্ধার ও জাতীয় কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ফলে বিষয়টি এখন অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
সূত্র জানায়, গত এক বছরে সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জসহ প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে তিনশতাধিক কারখানা বন্ধ হয়েছে। বিশেষ করে পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে বেশিরভাগ কারখানা বন্ধ হওয়ায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। মূল কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে আর্থিক সংকট, ঋণের উচ্চ সুদ, গ্যাস-বিদ্যুৎ গোলযোগ এবং শ্রমিক অসন্তোষ।
সরকারের লক্ষ্য প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা; সেই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য বন্ধ কারখানা দ্রুত উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা জরুরি বিবেচিত হচ্ছে। কেবল তহবিল না দিয়ে নীতিগত সহায়তারও প্যাকেজ বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে যাতে কারখানাগুলো দ্রুত ও স্থায়ীভাবে চালু করা যায়।
এই নির্দেশনার পরেই বাংলাদেশ ব্যাংক একটি ৪০ হাজার কোটি টাকার বিশাল রিফাইন্যান্স স্কিম চালুর প্রস্তাব তুলেছে। প্রস্তাবিত প্যাকেজের ভাগ: বড় শিল্পখাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা; কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (CMSME) জন্য ১০ হাজার কোটি; এবং কৃষিক্ষেত্রে ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ।
তহবিল গঠনের আগে ব্যাংকগুলোকে কারখানার তালিকা ও তাদের ঋণের হালনাগাদ তথ্য জমা দিতে বলা হয়েছে। বর্তমানে শুধু তাদের তালিকা চাওয়া হয়েছে যাদের ওপর ১০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে। সম্পূর্ণ বন্ধ ও আংশিক বন্ধ—উভয় ধরণের কারখানার আলাদা তালিকা তৈরির নির্দেশ আছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদের নেতৃত্বে গঠিত ১৯ সদস্যের কমিটি এই উদ্যোগ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রস্তুত করছে। কমিটিতে বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাহী ও কর্মকর্তারা রয়েছেন এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের মতামতও নেওয়া হয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-র নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকার যদি নীতিগত সুবিধা দিয়ে বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করার চেষ্টা করে, তা ইতিবাচক; তবে তহবিলের উৎস কী হবে—এটাই বড় প্রশ্ন। তিনি বলেন, বর্তমানে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের তারল্য সংকট এবং কিছু ব্যাংকের মূলধন নেতিবাচক অবস্থায়; সরকারের রাজস্ব আয়ও প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরাসরি রিফাইন্যান্স করলে মুদ্রাস্ফীতির ওপর চাপ পড়তে পারে। তিনি সুপারিশ করেছেন—যেসব ব্যাংকের তারল্য ভালো, সেখান থেকে আংশিকভাবে তহবিল সংগ্রহ করা এবং আসন্ন জাতীয় বাজেট থেকে এই খাতে একটি অংশ বরাদ্দ রাখা; পাশাপাশি স্কিম ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা উচিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকগুলো থেকে তালিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং বন্ধ কারখানা চালু করতে কী ধরনের সুবিধা দেওয়া যায় তা নিয়ে সরকার ও ব্যাংকের মধ্যে আলোচনা চলছে। আলোচনা চূড়ান্ত হলে তহবিল গঠন ও নীতিমালা ঘোষনা করা হবে। তিনি আরও জানান, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি বেশি হওয়ায় তহবিল গঠনে সরকারি অর্থের involvement বেশি সম্ভাবনাময়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সহজ শর্তে ঋণ করে কারখানাগুলোকে কাঁচামাল কিনতে সহায়তা দেয়া হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী এলসি খোলার সুবিধা বাড়ানো হতে পারে। তবে অর্থ পাচার বা অনিয়মে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো এই সুযোগ পাবে না; নতুন করে দুর্নীতির সুযোগ যাতে না-opening, সে ব্যাপারে কড়া নজর রাখা হবে।
ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা এই উদ্যোগকে ইতিবাচক বলে দেখছেন এবং কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছেন—ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে ডাউন পেমেন্ট শর্ত শিথিল করা, কারখানা চালুর সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করা, আমদানি-রফতানি সহজ করতে ব্যাংকিং সুবিধা বাড়ানো এবং কম মার্জিনে এলসি খোলার সুযোগ দেওয়া।
বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত ইতিবাচক; এগুলো দ্রুত উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা গেলে কর্মসংস্থান বাড়বে, উৎপাদন পুনরায় চালু হবে এবং GDP-তে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি উল্লেখ করেন যে বন্ধ কারখানা পুনরায় সচল করা নতুন কারখানা স্থাপনের তুলনায় কম সময় ও কম খরচে সম্ভব।
সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি কার্যকরভাবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে অর্থনীতিতে স্থবির মজুদ পুনরায় সক্রিয় হবে এবং সামগ্রিকভাবে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও বিনিয়োগ পরিবেশে ধনাত্মক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তবে তহবিল আবর্তন, পণ্যমূল্য চাপ ও অনিয়ম রোধ—এই তিনটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতেই বাস্তব সফলতা নির্ভর করবে।









