ঢাকা | শনিবার | ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৫ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

জুলাইয়ের চানখাঁরপুল হত্যাকাণ্ডে পুলিশের পোশাকধারীদের হিন্দি ভাষায় কথা বলার দাবি সাক্ষীর

২০২১ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকার চানখাঁরপুল এলাকায় ৬ জনকে গুলি করে হত্যা করার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা চলমান রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাক্ষ্য দিচ্ছেন বহু প্রত্যক্ষদর্শী। নাজিমুদ্দিন রোডের বাসিন্দা শহীদ আহম্মেদ এক সাক্ষী হিসাবে জানান, তিনি পুলিশের পোশাক পরে থাকা কিছু লোককে হিন্দি ভাষায় কথা বলতে শুনেছেন।

বুধবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে মোট তিনজন সাক্ষী তাদের বিবৃতিতে এই বক্তব্য প্রদান করেন।

এর মধ্যে রয়েছেন ৫ আগস্ট চানখাঁরপুলে মোহাম্মদ ইয়াকুবের (৩৫) হত্যা মামলার সাক্ষী তার মা রহিমা আক্তার এবং প্রতিবেশী শহীদ আহম্মেদ। ইয়াকুব ছিলেন ঢাকার নিউমার্কেট এলাকার একটি প্রতিষ্ঠানের ডেলিভারি ম্যান এবং নাজিমুদ্দিন রোডের মিলি গলির বাসিন্দা।

রহিমা আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলে ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় চানখাঁরপুলে গুলিবিদ্ধ হয়। গুলির শব্দ শুনে আমি বাসা থেকে বের হয়ে ছেলের ঠিকানা জানতে গলিতে উঠি, কিন্তু মহল্লার লোকজন আমাকে বাধা দেয় এবং জানায় যে তাকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরে আমি দেখি আমার ছেলের লাশ গলিতে এনে রাখা হয়েছে। তার শরীর থেকে রক্ত পড়ছিল এবং গুলির ছিদ্র পেটে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।’

তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন টিভি নিউজ এবং ভিডিওতে দেখেছেন, যারা গুলি করেছিল তারা ছাপা পোশাক পরেছিল, যেটা পুলিশের পোশাকের মতো ছিল। গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান তার ছেলে। এই দৃশ্য তার প্রতিবেশী শহীদ মোবাইলে ধারণ করেছিলেন।

রহিমা আক্তার সাক্ষ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তাদের দৃষ্টান্তমূখী শাস্তি দাবি করেন।

সাক্ষী শহীদ আহম্মেদ বলেন, ‘আমরা বেলা প্রায় ১১টা থেকে ১১:৩০টার মধ্যে গণভবনের উদ্দেশ্যে রওনা হই। চানখাঁরপুলে পৌঁছালে সেখানে হাজার হাজার মানুষ জড়ো ছিল। আমি পুলিশের পোশাক পরা এবং ছাপা পোশাকধারী পুলিশের হিন্দি ভাষায় কথা বলতে শুনেছি।’

তিনি বলেন, ‘পুলিশ লোকজনকে বাধা দেয় এবং ফাঁকা গুলি চালায়, ফলে আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ি। আঘাতপ্রাপ্ত একজনকে সাহায্য করতে গিয়ে জানতে পারি আমার ভাতিজা ইয়াকুবকেও গুলি লেগেছে। পরে তাকে অটোরিকশায় মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যাই, কিন্তু চিকিৎসকরা বলে দিয়েছেন সে মারা গেছে।’

শহীদ আরও জানান, তিনি জানেন যে এই গুলির বিরুদ্ধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন ইত্যাদির নামে অভিযোগ উঠেছে, যাদের নির্দেশে গুলি চালানো হয়েছে।

আরেক সাক্ষী মো: মহিবুল হক জানান, তার ভাই ইসমামুল হকও চানখাঁরপুলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। তিনি দূর থেকে ফোন পেয়ে হাসপাতালে যান এবং পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে তার ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পান। চিকিৎসকরা ময়নাতদন্ত না করায় তাদের অভিযোগ রয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা গত এপ্রিল মাসে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, যার ভিত্তিতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আসামিরা নিরস্ত্র এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছিল।

চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জানান, এটি একটি পদ্ধতিগত অপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। মামলায় মোট ৭৯ সাক্ষীর জবানবন্দি, ১৯টি ভিডিও, ১১টি পত্রিকা রিপোর্ট, অডিও, বই, রিপোর্ট এবং ৬টি ডেথ সার্টিফিকেট প্রমাণ হিসেবে দাখিল করা হয়েছে।

এই মামলা বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে একটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে এবং সঠিক বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবির আওয়াজ উত্থাপন করা হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছে এবং আগামীতে আরো সাক্ষ্য গ্রহণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।