নড়াইলের নবগঙ্গা নদী ভয়াবহ ভাঙন শুরু করেছে, যা এলাকাবাসীর জীবনে ব্যাপক সংকট সৃষ্টি করছে। কালিয়া উপজেলার নদী তীরবর্তী কয়েকটি গ্রাম, বাজার, ফসলিজমি, ঘরবাড়ি এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অবকাঠামো নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এ ভাঙনের ফলে এলাকার ভৌগলিক মানচিত্রই বদলে যাচ্ছে এবং নদীপারের মানুষ আতঙ্কে রাত কাটাচ্ছেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা।
গত পনেরো দিনের অবিরত বর্ষণের কারণে নবগঙ্গা নদীর পানির স্তর এবং স্রোত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কালিয়া উপজেলার বারইপাড়া, মাহাজন বাজার, বড়দিয়া নৌবন্দর, গৌড়ীয় মঠসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এসব এলাকাবাসী গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্কে রাত পার করছেন।
সরজমিনে দেখা গেছে, কালিয়ার কাঞ্চনপুর ও কালিয়া পৌরসভার উথলি গ্রামে শুরু হয়েছে ভাঙন, যেখানে অনেক ঘরবাড়ি, গাছপালা এবং বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বারইপাড়া-মাহাজন সড়ক, বসতভিটা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ নানা অবকাঠামো ভাঙনের কবলে পড়েছে। নদীর মধ্যে ভাঙনের কারণে ভেড়িবাধ ধ্বসে গেলে আশপাশের ২০টিরও বেশি গ্রামের হাজার হাজার একর ফসলের জমি পানিতে তলিয়ে যাবে এবং কয়েক হাজার মাছের ঘেরও ভেসে যেতে পারে। এই পানি লোহাগড়া ও সদর উপজেলার ৩০টি গ্রামে প্রবাহিত হবে।
কালিয়া পৌরসভার উথলি গ্রামের প্রায় ২০টি পরিবারের বাড়ি ও ফসলিজমি নদীর আগ্রাসনে বিলীন হয়েছে, যার মধ্যে বাচ্চু শেখ, পান্নু শেখ, শামু শেখ ও লিপি বেগমের পরিবারও রয়েছে। তারা জানিয়েছেন, তাদের চোখের সামনে বসতবাড়ি ও গাছপালা নদীতে বিলীন হতে দেখে মন ভেঙে গেছে, তবে রক্ষা করার তেমন কোনও সুযোগ পাননি। বর্তমানে তারা অভুক্ত শিশুদের কান্নার মধ্যে দিয়ে অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছেন। স্থানীয় কিছু মানুষ শুকনো খাবার দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
উথলি গ্রামের বাচ্চু শেক বলেন, ‘আমাদের পুরনো বাড়িঘর নদীতে চলে গেছে। একমাত্র ছোট একটি কুড়েঘরও বিলীন হয়েছে। এখন পরিবারের সঙ্গে খুব কষ্টে জীবন কাটাচ্ছি।’ একই এলাকার স্কুল শিক্ষক রোস্তম মোল্যা বলেন, ‘নদীতে প্রচণ্ড স্রোত বইছে, আমরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি। বাড়িঘর নদীতে বিলীন হওয়ায় আমরা ভেড়িবাধের খোপরির মধ্যে বাস করছি। ভাঙন এসব বাধ ভেঙে গেলে নড়াইল সদর ও লোহাগড়া উপজেলার বহু গ্রাম পানিবন্দী হয়ে পড়বে।’
নদীর ভাঙনের কারণে প্রায় ৩০ হাজার পুকুর, মাছের ঘের এবং ফসলিজমিও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা কৃষিপ্রধান এলাকার মানুষের জীবনযাত্রায় গভীর প্রভাব ফেলবে। লিপি বেগম এবং অন্য নদীপাড়ের বাসিন্দারা বসতবাড়ি হারিয়ে দিশেহারা, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় অতিষ্ঠ।
সংবাদ পেয়ে নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ সাহা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, উথলি গ্রামে ৯৫ মিটার দীর্ঘ ভাঙন দেখা দিয়েছে এবং তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে দ্রুত ভাঙন রোধে ১২০ মিটার এলাকায় জিওবাগ ফেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। নদী ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী ব্যবস্থার প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
অতিদ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে নড়াইলের নবগঙ্গা নদীর ভাঙনের কারণে এসব এলাকার মানুষ শুধু বসতবাড়ি ও ফসলই হারাবে না, তাদের জীবন ও জীবিকা দ্রুততর অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।








