ঢাকা | রবিবার | ৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২১শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

সীমান্তে পুশইনের চেষ্টা বাড়ছে, বিজিবি ও স্থানীয়রা প্রতিহত করেছেন

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে পুশইনের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। শনিবার (৬ জুন)ও কয়েকটি স্থানে এসব চেষ্টা চালানো হয়; তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাদের সতর্ক ও নিয়ন্ত্রিত তৎপরতায় বেশ কয়েক দফা পুশইন রোধ করতে সক্ষম হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা বিজিবির সঙ্গে মিলেই এসব অপপ্রচেষ্টা প্রতিহত করছে বলে দৈনিক বাংলা প্রতিনিধিরা জানান।

ঠাকুরগাঁওয়ে মশালগাঁও দিয়ে বিএসএফ ১১ জনকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করলে বিজিবি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের প্রতিহত করে। পরে আপনি-আমনি পর্যায়ে পতাকা বৈঠকে বিএসএফ ওই ১১ জনকে গ্রহণ না করার বিষয়টি অস্বীকার করে। দিনাজপুর ব্যাটালিয়ন (৪২ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মঈন হাসান জানান, সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও পুশইন প্রতিরোধে বিজিবি সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে।

দিনাজপুরের হিলি-ঘাসুড়িয়া সীমান্তেও ভোরে পাঁচজনকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, যা বিজিবি রুখে দিয়েছে। এছাড়া লালমনিরহাটের জেরার চারটি পয়েন্টে মোট ৩৩ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনাও সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে; বাধ্য হয়ে বিএসএফ তাদের ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নেয়। ১৫ বিজিবির মিডিয়া সেল জানায়, পুশইনের জন্য আনা সকল ব্যক্তিকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের ভূখণ্ডে ফেরত পাঠিয়েছে।

নওগাঁর সাপাহার সীমান্ত দিয়ে ১৭ জনকে পুশইনের চেষ্টা হলে টানা ১৯ ঘণ্টার চেষ্টার পরে রাতেই তাদের আবার ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ি প্রধান পাড়া সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘ ৩৫ ঘণ্টা প্যারাভাবে শূন্য রেখায় অবস্থান করে থাকা ১০ জন এখনও পাকিস্তিসহ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি—বিজিবি ও বিএসএফ উভয় পক্ষই তাদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেনি।

নীলফামারীর ৫৬ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, ঘটনাস্থলে অধিনায়ক পর্যায়ের পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং বিজিবি এই ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে।

শেরপুরের নালিতাবাড়ী সীমান্তেও বিএসএফের একটি সংগঠিত পুশইন নিরসন করা হয়েছে। ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়ন ৩৯ বিজিবি জানায়, রামচন্দ্রকুড়া বিওপির নিকট চেরাংপাড়া এলাকায় সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে আনুমানিক ৪০০ গজ ভারতের অভ্যন্তরে বাবুরামবিল ক্যাম্পের লোকজন ৫–৬ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার জন্য জড়ো করে রেখেছিল। তারা কাঁটাতারবিহীন এলাকা ব্যবহার করে জুমার নামাজের সময় সুযোগ নিয়ে ঠেলে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল বলে ধারণা করা হলেও বিজিবি ও স্থানীয় সীমান্তবাসীর সম্মিলিত প্রহরায় ওই প্রচেষ্টা বন্ধ করা যায়।

ঘটনার পর ৩৯ বিজিবির অধীনস্থ সকল বিওপিতে অতিরিক্ত জনবল মোতায়েন করা হয়েছে। পুশইনের সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, টহলদল সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে এবং সীমান্তের গ্রামবাসীদের সঙ্গে জরুরি সচেতনতামূলক সভা ও মাইকিং চলছে। স্থানীয় কোনো দালাল বা সহযোগী আছে কি না তা খতিয়ে দেখতে সোর্সিং করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ নুরুল আমিন বায়েজিদ বলেন, বিজিবি মাদকপাচার, চোরাচালান ও অবৈধ অনুপ্রবেশে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে।

মেহেরপুর গাংনী উপজেলার তেঁতুলবাড়ীয়া সীমান্তেও বিএসএফের পুশইন চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। সেখানে ৬ জন—৩ পুরুষ, ২ মহিলা ও ১ শিশু—বর্তমানে ভারতীয় ভূখণ্ডের কাঁটাতারের নিকটস্থ ঝোপে থেকে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তারা দাবি করছেন যে তারা বাংলাদেশি নাগরিক; তাদের কথায়, ২০২০ সালে তারা ভারতে গিয়ে কারাভোগ করেছে এবং পরে গত শুক্রবার বিএসএফ তাদের ধরে এনে সীমান্তের কাছে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে। কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে বিজিবি ও বিএসএফের পতাকা বৈঠক হলেও কোনো পক্ষই তাদের গ্রহণ করেনি, ফলে সীমান্তের কাছে তারা থেকে যাচ্ছেন। স্থানীয়রা তাদের মানবিকভাবে সাহায্য করার ডাক দিচ্ছেন, তবে সীমান্ত নিরাপত্তার দিক থেকেও সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।

অপরদিকে, গত শুক্রবার রাতে মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশকারী খুমি সম্প্রদায়ের ৪৭ জনকে বান্দরবানের রেমাক্রি এলাকায় বিজিবি হেফাজতে নিয়ে পরে পুশব্যাক করা হয়েছে।

সারাবিশেষ, সীমান্ত ঘাঁটিতে বিজিবি ও স্থানীয়দের একসূত্রে তৎপরতার ফলে বহু পুশইন চেষ্টা অব্যাহতভাবে প্রতিহত হয়েছে। সীমান্তে উত্তেজনা ও মানবিক সমস্যার সমাধানের জন্য দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় জরুরি বলে বিজিবি বারবার জানিয়েছেন।