ঢাকা | শুক্রবার | ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৯শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

স্বাস্থ্য খাতে বাজেট ও সংস্কারের নতুন দিশা

দেশের স্বাস্থ্য খাতের দৃশ্যপট একদিকে যেমন অর্থনৈতিক বৈপরীত্যের গল্প বলে, অন্যদিকে তা আমাদের দেশের মানুষের জন্য অজানা সংকটে পূর্ণ। সরকারি হাসপাতালের সীমিত সরবরাহ এবং দুর্বল সেবার কারণে সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসা অবহেলার দীর্ঘশ্বাস, আর বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ ও দামে পকেট খালি হওয়ার দুঃখ লুকানো যায় না। এই দুই ধরনের পরিস্থিতির মধ্যেই দেশের বৃহৎ জনসংখ্যার স্বাস্থ্যের সমস্যা বিরাজ করছে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার ও উন্নত সেবা পৌঁছানোর কার্যক্রম অনেকটাই অচল হয়ে থাকায় পরিস্থিতি আরও বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালে উন্নয়নের ক্ষেত্রে মূল বাধাগুলি ছিল প্রশাসনিক অচলাবস্থা, চিকিৎসকদের অসন্তোষ এবং দূর্বল নীতিগোষ্ঠী। শিশুদের মাঝে টিকা সরবরাহের ব্যর্থতা, হামের প্রকোপ এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, জনবল, ওষুধ ও যন্ত্রপাতির অভাব প্রকট। এসব সংকট কাটাতে সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক পরিবর্তন আনার জন্য একটি দৃঢ় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। জানা গেছে, অতীতের কেন্দ্রীয়ীকৃত, বিশেষজ্ঞের ওপর নির্ভরশীল ও প্রাথমিক চিকিৎসা উপেক্ষা করে চলা ভুলগুলো থেকে মুক্তি পেতে সরকার এই নতুন বাজেটের মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতের জন্য বিপ্লবী পরিবর্তন আনতে চাইছে। ২০২৬-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেড় গুণ বাড়িয়ে ৩৫ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এতে এই খাতে মোট বরাদ্দের ১১.৮৬ শতাংশ রাখা হয়েছে, যা পরিবহন, যোগাযোগ এবং শিক্ষা খাতের পর তৃতীয় স্থান। এই বরাদ্দের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ পাবে ২৬ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ পাবে ৮ হাজার ২২১ কোটি টাকা। সরকারের আশ্বাস, আগামীতে স্বাস্থ্যের জন্য বাজেটের অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার জন্য তারা কাজ করছে। গ্রামীণ এলাকায় আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ব্যাপক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার মধ্য দিয়ে দেশের ৫০ শয্যার হাসপাতালগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি আটটি উপজেলা হাসপাতালে ১০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে, সরবরাহ ও সরঞ্জামাদির আধুনিকীকরণসহ ডাক্তার ও নার্সের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। শিশু স্বাস্থ্য রক্ষায় চারটি বিভাগীয় শহর ও একক কুমিল্লা জেলাকে নতুন শিশুহাসপাতালের আওতায় আনা হচ্ছে, যাতে দ্রুত জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া, মাঠের উপযোগী প্রশাসনিক সংস্কার কার্যকর করতে বৈচিত্র্যপূর্ণ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে, যেন একসঙ্গে আরও ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা যায় এবং সার্বিক সেবা মান উন্নত হয়। ভবিষ্যতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়া হবে, যেখানে মাঠের কর্মীদের সমন্বিত প্রচার কার্যক্রমের মাধ্যমে গর্ভনিরোধক ব্যবহার ৫০ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে, অর্থ বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার এবং মাঠের বাস্তবায়নে বিশেষজ্ঞরা কিছু সংশয় প্রকাশ করেছেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, বরাদ্দের শতাংশ ও সময়মতো ব্যবহার হয় না বলে লক্ষ্য পূরণে সমস্যা হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে তারা পারদর্শিতা দেখাবেন। যদি এই বাজেট ও সংস্কার প্রক্রিয়া সততা, দক্ষতা ও সাবলীল বাস্তবায়নের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, তবে দেশের সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসা পকেটের বোঝা অনেক কমে আসবে। দেশের স্বাস্থ্যের মহাসড়ক কেবল কাগজে-কলমে নয়, সবার জন্য মুক্তির এক বসন্ত হয়ে উঠুক, সেটাই এখন প্রধান লক্ষ্য।