নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নবায়ন বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে ভাবনা-চিন্তা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশন বলছে, এনআইডির মেয়াদ ১৫ বছর হওয়ার পর তা বাধ্যতামূলকভাবে নবায়ন করানো হতে পারে — কারণ এই সময়ে মানুষের চেহারা, আঙ্গিক ও বায়োমেট্রিক ডেটায় পরিবর্তন আসে এবং তা পরিচয় স্বীকৃতিতে জটিলতা তৈরি করে।
আইনি ভিত্তি ও বিধিমালা
জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন-২০১০-এর ধারা ৭(১) অনুযায়ী এনআইডির মেয়াদ প্রদানের তারিখ থেকে ১৫ বছর। আইন ও বিধিমালায় নবায়নের প্রক্রিয়া ও ফি-সংক্রান্ত বিধান থাকলেও তা এখন পর্যন্ত বাধ্যতামূলক হিসেবে চালু করা হয়নি। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইসি মনে করছে, নিয়মটিকে কার্যকারিতা দেয়াই দরকার।
বিধিমালায় বলা আছে, নবায়নের জন্য প্রত্যেক নাগরিক বা তার আইনানুগ অভিভাবককে ফরম-৫ অনুযায়ী সরাসরি বা কমিশনের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন করতে হবে। সরাসরি আবেদন করলে ফি পরিশোধের রশিদের কপি সঙ্গে যুক্ত করে ‘জরুরি’ বা ‘সাধারণ’ হিসেবে দাখিল করতে হবে; অনলাইন আবেদনের ক্ষেত্রেও রশিদের স্ক্যানকৃত কপি ইলেকট্রনিকভাবে জমা দিতে হবে।
প্রক্রিয়া ও সময়সীমা
জরুরি আবেদন কমিশনে এবং সাধারণ আবেদন স্থানীয় কার্যালয়ে জমা দিতে হয়। আবেদন נקুল হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবেদনপত্রের অংশ ‘ক’ স্বাক্ষর করে আবেদনকারীকে ফেরত দেবেন বা অনলাইনে দিলে মোবাইল বা ই-মেইলে পাঠানো হবে। যদি আবেদনপত্রে ত্রুটি থাকে, কর্মকর্তা তা উল্লেখ করে ফেরত দেবেন যাতে আবেদনকারী প্রয়োজনীয় সংশোধন করে কাগজপত্র পুনরায় দাখিল করতে পারে।
আবেদনকারীকে অংশ ‘ক’-এ নির্ধারিত তারিখে কমিশন বা স্থানীয় কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে বায়োমেট্রিক ফিচার প্রদানসহ প্রয়োজনীয় সব ধাপ সম্পন্ন করতে হবে। বিধিমালায় বায়োমেট্রিক ফিচারের মধ্যে আঙুলের ছাপ, হাতের ছাপ, তালুর ছাপ, চোখের আইরিশ, মুখাবয়ব, ডিএনএ, স্বাক্ষর ও কণ্ঠস্বর উল্লেখ আছে; কিন্তু বর্তমানে কেবল আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিশ নেওয়া হচ্ছে।
নবায়ন সম্পন্ন হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবেদন ফরমের অংশ ‘খ’ স্বাক্ষর করে আবেদনকারীকে দেয় এবং নির্ধারিত তারিখে পুরাতন এনআইডি ফেরত নিয়ে নতুন এনআইডি (একই নম্বরেই) ফরম-২ বা ফরম-৪ অনুসারে প্রদান করা হবে। নিষ্পত্তির সময়সীমা হিসেবে বিধিমালায় জরুরি আবেদনের জন্য ৭ দিন ও সাধারণ আবেদনের জন্য ৩০ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। ভর্তুকি নির্ধারণ করে জরুরি আবেদনের জন্য ১৫০ টাকা ও সাধারণ আবেদনের জন্য ১০০ টাকা ফি উল্লেখ আছে।
হারানো/নষ্ট এনআইডির পেছনের ফি কাঠামো
এদিকে হারানো বা নষ্ট এনআইডি পুনরায় নেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমানে নেওয়া ফি–রও আলাদা নিয়ম আছে। সাধারণত কেউ নিজের চেষ্টা করে নতুন এনআইডির জন্য আবেদন করলে ফি বেশি পড়ে: প্রথমবার সাধারণ হলে ২০০ টাকা, জরুরি হলে ৩০০ টাকা; দ্বিতীয়বার সাধারণ ৩০০ টাকা, জরুরি ৫০০ টাকা; পরবর্তী যে কোনোবার সাধারণ ৫০০ টাকা ও জরুরি ১,০০০ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। এখানে দুটি অসুবিধা চিহ্নিত করা হয়েছে — হারিয়ে বা নষ্ট হয়ে নতুন এনআইডি নিলে তথ্য বদলায় না এবং টাকাও বেশি লাগে; আর নবায়ন করলে ছবি, আঙুলের ছাপ, আইরিশের মতো তথ্যে পরিবর্তন ধরা পড়ে এবং পরিচয় যাচাই সহজ হয়, সঙ্গে খরচও তুলনামূলক কম।
ইসির ব্যাখ্যা ও আগের মন্তব্য
ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেছেন, এনআইডির ১৫ বছর পূর্ণ হলে নবায়ন হওয়াই স্বাভাবিক; কেউ চাইলে যে কোনো সময় নবায়ন করে নিতে পারেন এবং হারিয়ে গেলে বা নষ্ট হলে আবেদন করে নতুন কার্ড পাবেন। ১৫ বছরে মানুষ চেহারায় পরিবর্তন আসে এবং এতে কারসাজির সুযোগ থাকতে পারে — এই কারণেই বাধ্যতামূলক করার ভাবনা চলছে এবং তা আমরা বিবেচনা করবো।
একই বিষয়ের পর্যালোচনায় এনআইডি মহাপরিচালক এএইচএম আনোয়ার পাশা বলেছেন, বিষয়টি এখনও পর্যালোচনার মধ্যে আছে। ইসি কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন বিষয়টি নথিভুক্ত করা হচ্ছে এবং তারা এটি জোরালোভাবে প্রস্তাব করতে চান। ফি আদায়ে ছাড় দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়ে নির্ধারণেরও বিষয় রয়েছে এবং সেটিও আলোচনা করা হবে।
পরবর্তী ধাপ
নতুন বিধিমালা যদি চূড়ান্ত করা হয়, তা হলে ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর আমলাতান্ত্রিক ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি অনুযায়ী প্রকাশ করা হবে এবং নাগরিকদের জন্য নির্ধারিত সময় ও ফি-নির্ধারণসহ প্রক্রিয়া পরিষ্কার করা হবে। ইসি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আইন ও বাস্তব কারণে কীভাবে, কোন কর্মপরিধি ও ব্যয়ে এটি বাস্তবায়ন করা হবে—সেসব দিকের পর্যালোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।








