ঢাকা | মঙ্গলবার | ২রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৬ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

‘সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম’ নিয়ে দরকষাকষিতে আটকা পড়ল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা ‘সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম’ সংক্রান্ত দরকষাকষির জটে আটকে পড়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলছেন, কীভাবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পরিচালনা করা হবে—এই ইস্যুতেই দুই দেশের মধ্যে আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো পরস্পরবিরোধী বার্তাকেই আলোচনাকে জটিল করার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

আরাগচি আরও জানান, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহপ্রকাশ করছে। তাই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম স্থানান্তরের প্রস্তাব নিয়ে ইরান রাশিয়ার সঙ্গে আলাপ করেছে। একই সময়ে চীনও উৎসাহ দিচ্ছে যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আলোচনাকে অব্যাহত রাখে—চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, বেইজিং বিশ্বাস করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হলওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার একটি টেকসই যুদ্ধবিরতি স্থাপন।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে টানাপোড়েনের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান যদি ২০ বছরের জন্য তার পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত করে, তবে তিনি সেটি মেনে নেবেন। তিনি এই কথা সাংবাদিকদের সামনে বলেন।

জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ফোনে ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলার পর জানান—দুই নেতা একমত হয়েছেন যে ইরানকে এখনই আলোচনার টেবিলে আসতে হবে এবং তাকে পারমাণবিক অস্ত্রধারী হতে দেওয়া যাবে না। পাশাপাশি মের্ৎস বলেছেন, ইরানকে অবশ্যই হরমুজ প্রণালীকে নিরাপদ রাখতে হবে।

তবে তেহরান নিজস্ব ভূমিকাও পুনরায় জোর দিয়ে বলছে যে হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তার রক্ষার ঐতিহাসিক দায়িত্ব ইরানই বজায় রাখবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব মন্তব্য করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে আলোচনার পরে। তিনি বলেন, ইরানের মিত্ররা বাণিজ্যের নিরাপত্তার জন্য তেহরানের ওপর নির্ভর করতে পারবে।

ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ক্ষোভও খবরের শিরোনামে এসেছে—চীন সফর শেষে এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি এক সাংবাদিককে তীব্রভাবে সমালোচনা করেছেন, তাকে ‘‘ভুয়া’’ বলে অভিহিত করে বলেন তার লেখা রাষ্ট্রদ্রোহের সমতুল্য।

অন্যদিকে মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট আশা করছেন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে পাইপলাইন সক্ষমতা বাড়ানোর ফলে হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব সময়ের সঙ্গে কমে যাবে। তিনি বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি বের করার জন্য বিকল্প পথ তৈরি হলে হরমুজের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমে আসবে, তবে ওই দেশগুলোর জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহের গুরুত্ব থাকবে।

সংকট আরও তীব্র হয়েছে সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক অভিযানের পর। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) অভিযোগ করেছে যে তারা ইরানের কিছু সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আত্মরক্ষামূলক হামলা চালিয়েছিল—ইরানের গোড়ুক শহর ও কেশম দ্বীপে রাডার ও ড্রোন স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে। সেন্টকম বলেছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি এমকিউ-১ ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার জবাবে এই অভিযান করা হয়েছে এবং তারা ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, একটি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন ও দুইটি একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোন ধ্বংস করেছে, যেগুলো আঞ্চলিক জলসীমায় চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্য ‘স্পষ্ট হুমকি’ ছিল।

ইরান সরকার থেকে এই হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা আরও বাড়বে। এবার কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখার পাশাপাশি সংঘাত আটকাতে আন্তর্জাতিক চাপ ও মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকাই ভবিষ্যতে নির্ধারণ করবে পরবর্তী সরণি।