দিল্লি ঘোষণা করেছে যে ভারতের বরিষ্ঠ নেতা ও সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদী শীঘ্রই বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেবেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার (২৭ এপ্রিল) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই নিয়োগের কথা জানায়।
এই পদে দীনেশ ত্রিবেদীর আগমন দুই সপ্তাহ আগে থেকেই ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে নিয়ে আলোচনা ছিল; এবার তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে কেন্দ্রীয় সরকার। তিনি পেশাদার কূটনীতিক প্রণয় ভার্মার স্থলাভিষিক্ত হবেন। প্রণয় ভার্মাকে ইতোমধ্যে বেলজিয়াম ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
৭৫ বছর বয়সী রাজনীতিবিদ দীনেশ ত্রিবেদীর ওপর এখন দুই দেশের মধ্যে নড়বড়ে সম্পর্ক ফেরানোই প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে। গত কয়েক বছরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এক পর্যায়ে শীতল হয়ে ওঠে; বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দু’দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন বৃদ্ধি পায়। তবে গত বছরের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ক্ষমতায় আসার পর দুই পক্ষই সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দিল্লি এখন মনে করছে যে দীনেশ ত্রিবেদী এই দূরত্ব ঘুচিয়ে কূটনীতিকিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবেন।
দীনেশ ত্রিবেদী বাংলা ভাষায় সাবলীল এবং তিনি একজন দক্ষ সেতারবাদক। দীর্ঘ দিনের পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থেকে তিনি দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বোঝাপড়ায়ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। অনেক ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এই নিয়োগকে বাংলাদেশকে দেওয়া নরেন্দ্র মোদির সরকারের একটি ‘বিশেষ বার্তা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।
ব্যক্তিগত জীবনের দিকে গেলে, দীনেশ ত্রিবেদী গুজরাতি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন—পিতা হীরালাল ত্রিবেদী ও মাতা উর্মিলাবেন। তিনি হিমাচলপ্রদেশের একটি বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনা করেন, পরে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে কমার্সে স্নাতক হন এবং পরবর্তী সময়ে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রি লাভ করেন।
রাজনৈতিক জীবনে তাঁর পথচলা শুরু কংগ্রেসে; আশির দশকে কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার পর ১৯৯০ সালে জনতা দলে সংযুক্ত হন এবং ১৯৯০-৯৬ পর্যন্ত রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস গঠিত হলে তিনি সেই দলে যোগ দেন ও দলের প্রথম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান।
২০০২-০৮ সময়ে তৃণমূলের রাজ্যসভা সদস্য ছিলেন তিনি। ২০০৯ সালে ব্যারাকপুর থেকে লোকসভায় জয়ী হয়ে মনমোহন সিংহ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল সরকার গঠনের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়লে রেলমন্ত্রকের দায়িত্বও সামলান—যদিও পরবর্তীতে সেই দায়িত্ব নিজে থেকে ছেড়ে যায়।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ব্যারাকপুর থেকে তিনি পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, কিন্তু সেসময় বিজেপির অর্জুন সিংয়ের কাছে হারেন। এরপর তৃণমূল তাকে আবার রাজ্যসভায় পাঠায়, কিন্তু সময়ের সঙ্গে তৃণমূলের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। অবশেষে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তিনি তৃণমূল থেকে পদত্যাগ করেন এবং ৬ মার্চ ২০২১ সঙ্ঘবাহিনীর শিবিরে যোগ দেন।
শাসন ও কূটনৈতিক প্রশ্নে দক্ষতা, সীমিত সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে দীনেশ ত্রিবেদীকে এখন একটি সংবেদনশীল মিশন—বাংলাদেশে সম্পর্ক মেরামত ও আস্থা ফিরিয়ে আনার কাজ—সৌজন্য ও কূটনৈতিক চালাকি ব্যবহার করে সম্পন্ন করতে হবে। দ্রুত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংযোগ তৈরি করে তিনি দু’পাশের মধ্যে আলোচনার পথ সুগম করতে পারবেন কি না, সেটাই এখন নজরের বিষয়।








